একদিন স্মৃতি হয়ে সকল স্মৃতির ঘটাবে অবসান

No Any widget selected for sidebar

মিলি সুলতানা,কুইন্স,নিউইয়র্ক থেকেঃ

আমার আম্মার রাজত্ব ছিল আমাদের গ্রামে। শরীরের ঘাম ঝরিয়ে নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন মহাপরাক্রমশালী এক রাজপুরী। যে রাজপুরীতে আমরা চারবোন ছিলাম রাজকন্যা চারভাই ছিল রাজপুত্র। আম্মা তো সুশাসন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সম্রাজ্ঞী ছিলেন। আজকের এই মিলেনিয়াম দশকে সেই সাম্রাজ্য বদলে গেছে। আব্বা পরলোকের মেহমান হয়ে গেছেন ৯৩ সালে। আব্বার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্থানের কারণে আমুল বদলে গেছে আমাদের স্বপ্নের সেই রাজপুরী। জীবনসাথীর বুকভাঙ্গা শোকে আম্মাও বদলে গেছেন। গ্রামে আমাদের রাজপুরীর আজ করুণ দশা। শত শত একর জমি জায়গা একা পড়ে আছে। তিনতলা বিল্ডিংটিতে সুনসান নিরবতা। এছাড়াও আরও দুটো একতলা বিল্ডিং তিনটে টিনের চৌচালা ঘর আছে। আমি নিজেও অবাক হই গ্রামে এত সম্পদ রেখে কি লাভ হল? যেখানে থাকার লোক নেই। বাড়ির এক ছেলের কাছে আমাদের ঘরের চাবি। বাড়িঘর জমিজমা দেখাশোনার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছেন। তার নাম ইউসুফ। আমাকে বহনকারী অ্যাশ কালার টয়োটা গাড়িটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আকাশে যেমন প্রচন্ড রোদ ছিল তেমনি সমঝোতা করে কালো মেঘও জমছিল। আস্তে আস্তে মেঘের প্রাধান্য বাড়লো। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। সাথে আমার দুই ছেলেমেয়ে। বাড়ির উঠোনে ১৭/১৮ জন নারী। তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে। সবাই আমার অপরিচিত। আমার আপাদমস্তক পরখ করতে শুরু করলো। জটলার মধ্য থেকে কানে এলো–“উনি কে? কোনদিন তো দেখি নাই। মনে হয় শেলি ফুফুর বোন। একজন আরেকজনকে বলছে, মনে হয় মিলি ফুফু। চেহারায় মিল আছে দেখেন না?” আমি কিছুটা বিব্রত হলাম। মনে মনে আমার পরিচিত কাজিন ভাবীদের খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু কাউকে পেলাম না। কেউ আলাদা বাড়ি করে অন্যত্র চলে গেছে। কেউ শহরের বাসিন্দা হয়েছে। ভাবলাম ওরা আমাকে চিনতে পারছেনা, ওদেরই বা কি দোষ! আমি তো বহু আগে থেকে শহরবাসী, তারপর আমেরিকাবাসী। পরে ওদের পরিচয় জানলাম। ওরা আমাদের বাড়ির বউঝি। বাড়ির সম্পর্কিত মুরব্বী স্থানীয় ভাই বোনদের পুত্রবধূ ওরা।

অনেকগুলো অপরিচিত মুখের ভীড় ঠেলে এগিয়ে এলো একজন। আমাদের “বড়বিবি” — এই মহিলা আমার আব্বার দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের পুত্রবধূ। সেই হিসেবে এই মহিলা আমাদের ভাবী হয়। কিন্তু আমরা আট ভাইবোন তাকে ডাকতাম, বড়বিবি। ছোটবেলা থেকে আমরা ভাইবোনেরা খুব ভালোবাসার সাথে তাকে বড়বিবি ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যখন হাফপ্যান্ট পরতাম তখন থেকে দেখতাম এই বড়বিবিকে আমাদের ঘরের কাজকর্ম করছে। কখনো তিন চোখ চার চোখওয়ালা মাটির চুলায় চিঁড়া ভেজেছে। কখনো মুড়ি ভেজেছে আবার কখনো খই। শীতের পিঠা বানানোতে বড়বিবির জুড়ি ছিল না। আমার আম্মার অতি স্নেহের তাজুর মা, আর আমাদের সবার বড়বিবি। কলজে ঠান্ডা হয়ে যায় বড়বিবি ডাকটির মধ্যে। ভাবী সম্বোধনে যে প্রশান্তিটা আসেনা। আমার বড়বিবির মুখে বয়সের ছাপ পড়ে গেছে। আমাকে চিনতে তার এক সেকেন্ডও দেরি হয়নি। বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল ফেলতে লাগলো। আমিও কাঁদলাম তার মমতার পরশে। বড়বিবি আগে স্লিম ছিল। এখন শরীরে মেদ জমেছে। গালে চোখের নিচে কপালে গলায় বলিরেখা পড়েছে। কিন্তু স্নেহ মমতার গায়ে বলিরেখা পড়েনি। শুনেছি ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে আর্থিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। পুত্রবধূরা শাশুড়িকে কাজ করতে দেয় না।

বড়বিবির এখন সুখের কাল চলছে। থাকুক না একটু আরামে। জীবনের অর্ধেক কাল আমাদের সংসারে কায়িক পরিশ্রম করে কাটিয়ে দিয়েছে। দারিদ্র্যতার মধ্যে কেটেছে তার জীবন। বহু কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের বড় করেছে। পুত্রবধূরা এখন তাকে সুখ দিচ্ছে সম্মান দিচ্ছে। বড়বিবির সাথে কয়েকটা ছবি তুলে রাখলাম। এই ভালোবাসার মধ্যে দূষণ নেই — তাকে জড়িয়ে ধরে অনুভব করলাম। আমাদের দোতলা ঘরের প্রত্যেকটি কামরায় ঢুকলাম। কত স্মৃতির মহামূল্যবান মোহর লেগে আছে দেয়ালে, আসবাবপত্রে। এককালে এখানে মানুষজন ভরা ছিল। বাচ্চাদের কলকাকলি ছিল। সব জড় পদার্থ ঠিক ঠিক স্থানে পড়ে আছে। নেই শুধু মানুষ। বুক চুরমার হয়ে কান্না এলো। আমাদের সেই রাজপুরী আজ ভুতুড়ে বাড়ির মত। আর টিকতে বেশিক্ষণ টিকতে পারলাম না। দোতলা থেকে নেমে এলাম উঠোনে। দেখলাম আমার উনিশ বছর বয়সী ছেলে পিয়াল উঠোনে পা বিছিয়ে বসে মাটির উপর হাত বুলাচ্ছিলো। ওর চোখের পাতায় ঝকঝকে মুক্তোর মত অশ্রুবিন্দু। বুঝলাম ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে। যখন ছোট ছিল চিটাগাং থেকে বছরে কয়েকবার নানাবাড়ি যাওয়া হত। মামাতো খালাতো ভাইবোনদের সাথে এই সোনামাটির উপর খেলতো, গড়াগড়ি খেতো। স্বাভাবিকভাবেই সেই স্মৃতি ওকে কাঁদাবে। আমি কষ্টের ঢোক গিলে পায়ের পাতায় ভর করে ওর পাশে বসলাম। ওর মাথায় হাত বুলালাম। এই মাটিতে শত সহস্রবার পদচারণা ঘটেছে ওর। আজ সব স্মৃতি আশির দশকের সাদাকালো সিনেমার মত। এই ছেলে তার মায়ের মত হাত পা ছেড়ে দিয়ে স্মৃতিশোকে মুহ্যমান। আমরা মা ছেলে শব্দহীন কাঁদছি। বাতাসে শোনা গেল বেদনার ফিসফিসানি।

-এসএম

bangladaily

Bangladaily24.com is a Popular online Bangla Newspaper from Dhaka.

Related Posts

Create Account



Log In Your Account